Breaking News:

নাসিরনগরে তিনশত বছরের ঐতিহ্যবাহী শুটকি মেলা, জমজমাট কেনাবেচা

স্টাফ রিপোর্টার: মোহাম্মদ সাদেকুল ইসলাম
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
সংগৃহীত ছবি:
সংগৃহীত ছবি:

স্টাফ রিপোর্টার: মোহাম্মদ সাদেকুল ইসলাম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার কুলিকুন্ডা গ্রামে শত বছরের ঐতিহ্য ধরে আবারও বসেছে ব্যতিক্রমধর্মী শুটকি মেলা। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও আয়োজন করা হয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী মেলার, যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
উৎসবমুখর পরিবেশে জমে উঠেছে কেনাবেচা, আর সেই সঙ্গে ফিরে এসেছে গ্রামীণ সংস্কৃতির পুরোনো আবহ।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকাল থেকেই শুরু হয় দুই দিনব্যাপী এই মেলা, যা বাংলা সনের দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হলেও স্থানীয়দের কাছে এটি এখনো পহেলা বৈশাখের মেলা হিসেবেই পরিচিত। বহু বছর আগে থেকে চলে আসা এই মেলায় একসময় পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে লেনদেন হতো। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এখন সেখানে নগদ টাকার লেনদেন হলেও ঐতিহ্যের ছাপ এখনো অটুট রয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রায় দুই থেকে তিনশত বছরের পুরনো এই মেলা কেবল একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, বরং এটি একটি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। এখানে দেশের বিভিন্ন জেলা—সিলেট, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জসহ নানা অঞ্চল থেকে শুটকি ব্যবসায়ীরা তাদের পসরা নিয়ে হাজির হন। ফলে মেলাটি পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ শুটকি বাজারে।

মেলায় প্রায় দুই শতাধিক প্রজাতির শুটকি মাছের সমাহার দেখা গেছে। বিভিন্ন স্টলে সাজানো হয়েছে দেশীয় ও সামুদ্রিক নানা প্রজাতির মাছের শুটকি। গজার, শোল, বাইম, বোয়াল, ছুড়ি, লইট্টা, পুটি, টেংরাসহ দেশীয় মাছের শুটকির পাশাপাশি বিরল সামুদ্রিক মাছের শুটকি ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এমনকি ইলিশ মাছের ডিমের শুটকি এবং কার্প জাতীয় মাছের বিশেষ প্রক্রিয়াজাত শুটকিও পাওয়া যাচ্ছে, যা অনেকের কাছেই বিশেষ আকর্ষণ।

শুটকির দামও ভিন্নতা অনুযায়ী নির্ধারিত হচ্ছে। প্রতি কেজি শুটকি ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে। ভালো মানের ও বিরল প্রজাতির শুটকির দাম তুলনামূলক বেশি। বিক্রেতারা জানান, দেশীয় মাছের শুটকির চাহিদা সবচেয়ে বেশি, কারণ এগুলোর স্বাদ ও গুণগত মান ক্রেতাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। এছাড়াও ভারত থেকে আমদানি করা কিছু শুটকিও মেলায় বিক্রি হচ্ছে।

মেলায় আসা ক্রেতাদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনার কোনো কমতি নেই। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই এই মেলায় অংশ নিচ্ছেন। শুটকি কিনতে আসা মাসুক মিয়া বলেন, “ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে এই মেলায় আসতাম। এখনো সেই স্মৃতি ধরে রাখতে প্রতি বছর আসি। এখানকার শুটকির স্বাদ ও বৈচিত্র্য অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।”
কলিকুন্ডা গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কেএম বশির উদ্দিন তুহিন জানান, “এই মেলাটি আমাদের এলাকার গর্ব। প্রায় দুই শত বছরের ঐতিহ্য ধরে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষের দ্বিতীয় দিনে এই মেলা শুরু হয় এবং দুই দিনব্যাপী চলে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুটকি প্রেমীরা এখানে ভিড় করেন। প্রতি বছর এই মেলায় কোটি টাকার শুটকি বিক্রি হয়।

শুধু কেনাবেচাই নয়, মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। ছোট ছোট দোকান, খাবারের স্টল, গ্রামীণ খেলাধুলা এবং নানা আয়োজন মেলাটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের ভিড়ে সরগরম হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।

ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের এক অনন্য মেলবন্ধন হিসেবে নাসিরনগরের এই শুটকি মেলা আজ শুধু একটি বাজার নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন এলেও এই মেলার প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও আগ্রহ একটুও কমেনি। বরং প্রতি বছরই এটি নতুন করে আকর্ষণ সৃষ্টি করছে দেশের নানা প্রান্তের মানুষের কাছে।

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত